গাড়ির যত্ন শুরু

আজ কথা বলবো গাড়ির যত্ন বিষয়ে সাধারণ কিছু টিপস এন্ড ট্রিকস্ নিয়ে। আপনার মোটরগাড়িটি নিশ্চয় আপনার খুব প্রিয় জিনিস। আর দরকারি তো বটেই। যদি অনেকদিন ধরে প্রিয় জিনিসটিকে কাজে লাগাতে চান, তবে গভীর মমতা আর গুরুত্বের সঙ্গে গাড়ির যত্ন নিতে হবে। আমরা এখানে সরল আর সোজাসুজি ভাষায় বর্ণনা করবো কিভাবে আপনার গাড়ির যত্ন নেবেন।

গাড়ির যত্ন শুরু
গাড়ির যত্ন

সেটার আগে জানা দরকার গাড়ির বিভিন্ন অংশ এবং সেগুলোর কাজ সম্পর্কে। তারপর জানতে হবে কেন সেগুলোর যত্ন নিতে হবে আর কিভাবে নিতে হবে। এগুলো বোঝার জন্যে আপনাকে আগেই বিশেষজ্ঞ হবার দরকার নেই। পর্যায়ক্রমে সবকিছুই বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি আমরা।

গাড়ির পার্টস বা অংশসমূহ [ গাড়ির যত্ন ] :

আজকাল যেসব গাড়ি তৈরি হয়, তাতে ৫০০০-এর মত পার্টস বা যন্ত্রাংশ থাকে । প্রত্যেকটির রয়েছে নির্দিষ্ট ভূমিকা। কিন্তু অত পার্টসের খবরে আমাদের দরকার নেই।

আমরা বোঝার সুবিধের জন্যে পার্টস এর কার্যকলাপ বা সিসটেমের ভিত্তিতে কয়েকটা গ্রুপে ভাগ করে নেব। যেমন ধরুন “ব্রেক” সংক্রান্ত কাজে যেসব পার্টস জড়িত, সেগুলোর জন্যে একটা গ্রুপ করা হবে, এবং তার নাম দেয়া হবে ব্রেকিং সিসটেম। এভাবে আমরা এই সিরিজে মোটামুটি বেসিক ৮টা গ্রুপ করা হয়েছে। ৮টি পৃথক অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে সিসটেমগুলো।

বডিওয়ার্ক : বডিওয়ার্ক মানে গাড়ির খোলস। এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় গাড়ির অন্য সিসটেমগুলো।

টায়ার ও চাকা : গাড়ির সঙ্গে রাস্তা বা মাটির একমাত্র সংযোগ হিসেবে কাজ করে।

ব্রেক: গাড়ির গতি কমানো বা থামানোই এর কাজ।

স্টিয়ারিং : স্টিয়ারিং সামনের চাকাগুলো ঘোরায়, চালকের ইচ্ছেমত ডাইনে, বাঁয়ে বা সোজা দিকে গাড়ি ছোটায়।

ইলেকট্রিক্ক্ সিসটেম : এঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার শক্তি উৎপাদন, আর সেই সঙ্গে আরও কয়েকটা ছোটখাট কাজে এর দরকার হয়।

ট্রান্সমিশনঃ এঞ্জিন যে-শক্তি উৎপাদন করে, তা চাকায় প্রবাহিত করে এই সিসটেম।

এঞ্জিনঃ গাড়ি চালানোর জন্যে দরকারি শক্তিটুকু উৎপাদন করে এঞ্জিন।

সাসপেনশন : বড়ির সঙ্গে চাকাগুলোর সংযোগ স্থাপন করে, আর গাড়িকে রক্ষা করে ঝাঁকুনির হাত থেকে। একটা কথা। বিভিন্ন ডিজাইনের গাড়ি তৈরি হয়। কোনটার এঞ্জিন থাকে সামনে, কোনটার বা পেছনে।

আমরা এখানে এক টিপিক্‌ল্ গাড়ির গঠন প্রণালী বর্ণনা করেছি। আপনার গাড়ির গঠন এর মত না-ও হতে পারে, কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা নেই। মূল কার্যপ্রণালী সব ডিজাইনের ক্ষেত্রেই এক রকমের।

A Car body [ গাড়ির সাধারণ যত্ন ] , Photo Source : https://learnmech.com/nomenclature-of-car-body-car-body-parts/
A Car body

“চলছে যখন, চলুক না” মনোভাব [ গাড়ির যত্ন ]

যখন প্রথম কিনলেন গাড়িটা— হোক সে নতুন বা পুরানো—গর্বে আপনার বুক ভরে গিয়েছিল, তাই না? কিন্তু সেই মনোভাব যদি ধরে রাখতে চান, গাড়ির উপযুক্ত যত্ন নিতে হবে আপনাকে। যদি না নেন, ক্রমেই জিনিসটা আপনার কাছে বোঝা হয়ে উঠবে। গ্যারাজের বিল দিতে দিতে হয়রান হবেন। গাড়ি চালিয়ে সুখ পাবেন না। বিক্রি করেও উপযুক্ত দাম মিলবে না। ‘চলছে যখন, চলুক না’ আপনার এই মনোভাব কিন্তু গাড়ির জন্যে খারাপ। নির্দিষ্ট এবং যুক্তিসঙ্গত মেইনটেন্যান্স দরকার আপনার গাড়ির।

সে-পরামর্শই এখানে দেয়া হয়েছে। যদি ঠিকমত সেগুলো মেনে চলেন, খরচা কমে যাবে। গাড়ি চালিয়েও সুখ পাবেন। সমস্যা বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই সতর্ক হোন, প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নিন। অধিকাংশ গাড়ি চালক শুধু দুটো জিনিস লক্ষ করেনঃ টায়ারের প্রেশার আর তেলের লেভেল। কিন্তু আরও অনেক ছোটখাট জিনিস আছে, যেগুলো পরীক্ষা করে নিলে অনেক বিপর্যয় আর ঝামেলা এড়াতে পারবেন। একে একে সেগুলো বর্ণনা করব আমরা।

গাড়ির বডি [ গাড়ির যত্ন ]:

গাড়ির বড়ি শুধু চালক আর আরোহীদের ছাদ-ঢাকা ঘরের মত নয়, এর আরও কাজ আছে। বডি গাড়ির অনেকগুলো অংশের সংযোগ বা ফ্রেম হিসেবেও কাজ করে। এই ফ্রেম সাধা রণত শক্ত, অনড় আর নির্ভরযোগ্য।

বডিওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজটা খুবই জরুরি, কিন্তু কঠিন নয়। অনেকগুলো বিষয় আপনাকে বিবেচনায় আনতে হবে। গাড়িটা সুন্দর দেখাবে, পরে বিক্রি করার সময় ভাল দাম পাবেন, বড়ি মজবুত থাকলে চালক ও আরোহীর নিরাপত্তার জন্যেও ভাল হবে। তাই নিয়মিত বড়ির যত্ন নিন। সবসময় ধুয়ে মুছে ফিটফাট রাখুন। অল্প একটু আঁচড় লাগলে বা তুবড়ে গেলে উপেক্ষা করবেন না। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিন।

গাড়ির যত্ন শুরু
গাড়ির বডি [ গাড়ির যত্ন]

পার্টসগুলোর সংযোগের জন্যে মোটর সাইকেল বা সাইকেলের মত এখানে আলাদা কোন ধাতব ফ্রেমওয়ার্ক নেই। বডিটুকুই সম্বল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড়ি হালকা ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয়; প্রয়োজনমত বাঁকিয়ে জুড়ে দেয়া হয় ওয়েলডিং-এর সাহায্যে কিংবা বল্টু এঁটে আজকাল শক্ত প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম আর ফাইবার গ্লাসও ব্যবহার করা হচ্ছে বড়ি তৈরির জন্যে।

বাইরের দিকের যত্ন : পেইন্ট আর মেট্‌ল্‌ ওয়ার্ক ধুয়ে পরিষ্কার রাখা উচিত। এর সুফল অনেকগুলো। ঝাঁ-চকচকে, নতুন গাড়ির মতই মনে হবে আপনার গাড়ি— বেশ কয়েক বছর চালানোর পরেও। মরিচা ধরবে না। আঁচড় কিংবা দাগ পড়লে চট্ করে চোখে পড়বে।

ধোয়ার কাজ শুরু করার আগে গাড়ির দরজা, জানালা, বুট আর বনেট ভালভাবে বন্ধ করুন। জানালা, কোন ফাঁক কিংবা সিল-এর মুখে হোস পাইপের পানি ছুঁড়বেন না। ধুলো-ময়লা ধুয়ে যাবার পর কার শ্যাম্পু দিয়ে ফেনা তৈরি করে স্পঞ্জের সাহায্যে ডলে ধুয়ে নিন আগাগোড়া। শ্যাম্পু যদি মোমের তৈরি হয়, জানালার কাচে লাগাবেন না। কোথাও টার বা অন্য কোন রঙের আঁচড় পড়লে সাদা স্পিরিটের সাহায্য নিতে পারেন। এরপর মসৃণ কাপড় খণ্ড বা ক্রোম ক্লিনার দিয়ে মুঝে ফেলুন বড়ি।

মাঝে মাঝে (তা, ধরুন বছরে এক বা দু’দিন) বডির পেইন্ট ওয়ার্কের ওপর মোম পালিশ করা গেলে খুব ভাল হয়। নইলে পলিমার সিল্যান্ট দিয়েও ঘসে নিতে পারেন। এতে রঙ আর বড়ির ধাতব উপরিভাগ রোদ, পানি, লবণ আর ধুলোর ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে। নির্মাতার পরামর্শ মনে রাখবেন। নতুন রঙ লাগানোর পর দু-তিন মাস বডিতে মোম পালিশ করানোর প্রশ্নই ওঠে না।

 

গাড়ির উপরিভাগের যত্ন [ গাড়ির যত্ন ] :

পেইন্টের হালকা আস্তরণ হচ্ছে বড়ির ধাতব উপরিভাগ রক্ষার একমাত্র উপাদান। অল্প একটু পেইন্ট চটিয়ে দেখুন, অবিলম্বে সেখানে মরিচা পড়বে। যদি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা না নেন, ছড়িয়ে পড়বে মরিচা, সম্প্রসারণ ঘটাবে সারা বডিতে।

ছোটখাট আঁচড় আর দাগ দেখা গেলে কী করবেন?

১। চারপাশ থেকে কিছুটা পেইন্ট তুলে ফেলুন।

২। সিলিকোন সলভেন্ট-এর সাহায্যে জায়গাটা পরিষ্কার করুন এবং মোম বা পালিশের অবশেষ নিশ্চিহ্ন করুন। মরিচা রোধক কোন ভাল লিকুইডের প্রলেপ দিন ওই জায়গায়।

৪। নির্মাতার পরামর্শ মোতাবেক বডির ধাতুর ওপর উপযুক্ত প্রাইমার লাগান। মনে রাখবেন, বিভিন্ন টাচ-আপ রঙের জন্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাইমার দরকার।

৫। ছোট ব্রাশের সাহায্যে সঠিক রঙের টাচ-আপ পেইন্ট লাগান। প্রথমে পাতলা করে এক পরত লাগাবেন। সেটা শুকিয়ে গেলে আবার দেবেন এক পরত। এভাবে চালিয়ে যাবেন পেইন্টিং-পুরো জায়গাটা মূল রঙের সঙ্গে না মেশা পর্যন্ত।

আঁচড় বা কাটা অংশ যদি বেশি জায়গা জুড়ে দেখা দেয়, মরিচার পরিমাণও বেশি হতে পারে। এই মরিচা দূর করার জন্যে আরও বেশি কষ্ট করতে হবে আপনাকে। মসৃণ দুই খণ্ড কাপড় নেবেন-শুকনো আর ভেজা। পুরো জায়গাটা পরিষ্কার করে কাপড় খণ্ডগুলোর সাহায্যে ভালভাবে ঘসে নিন। মরিচা জন্মে থাকলে তা দূর হবে। তারপরও সেখানে মরিচারোধক লিকুইডের প্রলেপ দেওয়ার দরকার হবে। মরিচা বেশি হলে পানি ব্যবহারে কার্পণ্য করবেন না। এরপর সেখানে ব্রাশের সাহায্যে পেইন্ট লাগান কিংবা স্প্রে-র ব্যবস্থাও করতে পারেন। আরও একটা কথা। বুট বা বনেটের ভিতরের দিকে ভালভাবে লক্ষ করবেন কোথাও মরিচা ধরেছে কি না।

তলার দিকের যত্ন [ গাড়ির যত্ন ]

গাড়ির ভিতরের দিকে আমাদের দৃষ্টি পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু ভিতরের দিকের ক্ষত এবং সেখান থেকে মরিচা ছড়িয়ে আপনার গাড়ির তেরোটা বাজিয়ে দিতে পারে। এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ময়লা-কাদা জমে, বড়ির স্থায়ী ক্ষতির কারণ ঘটায়। যদি দেখতে পান, কাদা জমে শক্ত হয়ে গেছে, গ্যারাজে নিয়ে যান গাড়ি। স্টিম ক্লিনিং-এর ব্যবস্থা করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়। এরপর অবশ্য তলার অংশ পরিষ্কার রাখা আপনার জন্যে সহজ হবে। মাঝে মাঝে শক্ত ব্রাশের সাহায্যে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন সমস্ত জায়গা।

মরিচা দেখতে পেলে জায়গাটা ঘসে পেইন্ট তুলে ফেলবেন। রেড অক্সাইড পেইন্ট ব্যবহার করে পূরণ করবেন জায়গাটা। দরকার হলে বডি একস্‌ল ষ্ট্যাণ্ডের ওপর দাঁড় করিয়ে চাকা খুলে ফেলুন। ও হ্যাঁ, গাড়ির কোম্পানির পরামর্শের কথা ভুলবেন না। যেন। তাদের পরামর্শ পত্রে অবশ্যই একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন। গাড়ির তলায় মাথা গুঁজে এইসব বিষয়ে লক্ষ রাখা ভাল।

  • ব্রেক ফ্লুইড, তেল বা পানি চুঁইয়ে পড়ছে কি না।
  • যে সব নাট ও বল্টু দেখা যায়, সেগুলো, টাইট আছে কি না।
  • এগজস্ট সিসটেম ঠিক আছে কি না
  • কোথাও কোন ক্ষয় ধরেছে কি না।

ভিতরের দিকের যত্ন [ গাড়ির যত্ন ]

ভিতরের দিকটা বছরে অন্তত একবার পুরোপুরি পরিষ্কার করা উচিত। তা ছাড়া বডি ভাল রাখতে হলে মাঝে মাঝেই ছোটখাট পরিচ্ছন্নতার দিকে লক্ষ রাখবেন। যেমন :

  • ভিজা কাপড় দিয়ে ভিতরের দিকের পেইন্ট ওয়ার্ক, আপহোলস্টারি আর প্লাস্টিকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মুছতে হবে।
  • অ্যাশ ট্রে আর আবর্জনা পাত্র খালি করে ঝেড়ে মুছে রাখতে হবে।
  • কাচ ধুয়ে মুছবেন। সবচেয়ে ভাল হয় এ-কাজে শ্যামোয়া বা হরিণের চামড়া খণ্ড ব্যবহার করা।
  • খুঁজে দেখুন, বাইরে থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ছে কি না। যদি লীকেজ ধরা পড়ে, সিলিং কমপাউণ্ড ব্যবহার করুন।
  • সিট বেল্ট ঠিক আছে তো? না থাকলে নতুন সিট বেল্ট লাগিয়ে নিন।
  • যখনই ভিতরের দিকে পরিষ্কারের কাজে হাত দেবেন, সিট আর কারপেট উলটে নাট-বল্টুর অবস্থা পরখ করবেন।
  • পেডল রাবারের কী অবস্থা, দেখুন। পুরানো, জীর্ণ হয়ে থাকলে সেগুলো বদলে ফেলুন। এ-রকম অবস্থায় পেড়ল, বিশেষ করে ব্রেক পেড্‌ল্ পিচ্ছিল আর মসৃণ হবে; যা ধ্বংসাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
  • ব্রেক এবং ক্লাচ পেড়ল্-এর আশেপাশে ব্রেক ফ্লুইড লিক করছে কি না পরীক্ষা করুন। যদি তেমন কিছু চোখে পড়ে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
  • এ-ছাড়া বিভিন্ন হিঞ্জ, জয়েন্ট, ক্যাচ ও বিয়ারিং-এর লুব্রিকেশনের দিকেও লক্ষ রাখতে হবে আপনাকে।

 

“গাড়ির যত্ন শুরু”-এ 4-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন